১৯শে ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং, বুধবার

সৌদিতে অনৈতিক কাজে রাজি না হলে ইনজেকশন দিত কফিল ।

আপডেট: জুলাই ২৫, ২০১৮

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হইয়া দেশে ফিরছেন আরও ৪৩ নারী। গত শনিবার ২১ জুলাই রাত ৯টার দিকে দেশে ফিরেন তারা।অমানুবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছে এসব নারীরা। এমনটিই জানান ফারিয়া (ছদ্মনাম) নামের এক নারী।দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হওয়া এই ৪৩ জন নারী গৃহকর্মী ছিলেন সৌদির ইমিগ্রেশন ক্যাম্পে। তাদের মধ্যে ফারিয়া ছিলেন একজন।

জানা যায়, গৃহকর্মী হিসেবে সৌদিতে গিয়েছিলেন ফারিয়া (ছদ্মনাম)। সেখানে একটি বাসায় কাজে ছিলেন সাত মাস। কিন্তু এই কয় মাসে বাসার মালিক, মালিকের স্ত্রী ও সন্তানরা ফারিয়া (ছদ্মনাম) ওপর অকথ্য নির্যাতন চালান বলে অভিযোগ তার। নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না ফারিয়া (ছদ্মনাম)। দালালের মাধ্যমে সৌদিতে যাওয়ার পর তাকে একটি বাসায় কাজ দেওয়া হয় ফারিয়াকে। কিন্তু কাজ শুরুর প্রথম দিনেই বাসার মালিক তাকে গভীর রাতে ডেকে শারীরিক সম্পর্ক করার প্রস্তাব দেয়। এতে ফারিয়া রাজি হয়নি। পরে আবারও তাকে একই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাসার মালিকের কু প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তার ওপর শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন । প্রথম দিকে তাকে মারধর করা হতো কিন্তু শেষের দিকে গিয়ে তার জোরপূর্বক শরীরে ইনজেকশন পুশ করত মালিক ও মালিকের স্ত্রী। এরপর কী ঘটত কিছুই বলতে পারতেন না ফারিয়া।

এরপরও মাথায় গরম চা-ও ঢেলে দেওয়া হত । প্রতিদিন তাকে খাবার ও দিত না মালিক আর পুরা তিনতলা বাড়ির কাজ তাকে একাই করতে হতো ,কাজে কোনো হেরফের হলেই মালিকের বউ ও মেয়ে মারধর করত।গত সাত মাসে মাত্র দুবার তাকে তার গ্রামের বাড়িতে ফোন করতে দেওয়া হয়েছে। প্রতিমাসে তাকে বেতন দেয়ার কথা থাকলেও তার বেতন দেওয়া হতো প্রতি তিন মাস পরপর। অর্থ্যাৎ, তাকে মাত্র দুবার বেতন দেওয়া হয়েছে। বাকি বেতনের টাকা ফারিয়া পাননি।

ফারিয়া নির্যাতনের ঘটনাগুলো যেমনভাবে বলেছিলেন তা নিম্নরূপ,
প্রথম তারা আমার লগে খারাপ কাজ করতে চাইত,খারাপ কাজ না করলে সুঁই দিত। যখন সুঁইগুলা দিত, তখন মাথা ঘুইরা পইরা যাইতাম, অজ্ঞান হইতাম; কিচ্ছু বলতে পারতাম না।

কোন এজেন্সির মাধ্যমে তিনি সৌদিতে গিয়েছিলেন, তা জানাতে পারেননি ফারিয়া। ফারিয়া এতোটাই অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন যে তিনি মানসিক ভাবে সুস্থ ছিলেন না, তিনি কিছু কিছু সময় সঠিক তথ্য দিলেও মাঝে মাঝে সব ভুলে যাচ্ছিলেন।ফারিয়া জানান, কেন তাকে ইনজেকশন দেওয়া হতো, তা তিনি বুঝতে পারতেন না। খারাপ কাজ করতে চাইলে বাঁচার জন্য তিনি সবার সামনে বসে নামাজ পরতেন। ফারিয়ার শরীরে ৩০টা ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে।

ইনজেকশন তার শরীরে পুশ করার পর কেমন অবস্থা হতো জানতে চাইলে ফারিয়া বলেন, আমার মাথা ঘুরান দিয়া পইরা যাইতাম, মাটিত পইড়া অজ্ঞান হইয়া যাইতাম,তার পর কি হইত কিসু কইতে পারতাম না , আল্লাহ ওগো বিচার কইরবে।ফারিয়া জানান, তার কোনো একসময় বিয়ে হয়েছিল কিন্তু স্বামীর সঙ্গে সংসার করা হয়নি। সৌদি যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বাবার বাড়িতেই থাকতেন। বাড়তি আয়ের আশায় দালালের মাধ্যমে সৌদি পাড়ি জমান ফাড়ীয়া। কিন্তু মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে ফারিয়া যে দেশে ফিরছেন, খবরটি সে আসার দিন পর্যন্ত জানতে না তার পরিবার । আজ মঙ্গলবার ফারিয়াকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হতে পারে বলে জানিয়েছিলেন অভিবাসন শাখার সংশ্লিষ্টরা।

ব্রাকের মাইগ্রেশন বিভাগের হেড অব প্রোগ্রাম শরিফুল হাসান বলেন, ফারিয়ার পরিবারের খোঁজ আমরা পেয়েছি।ফারিয়ার সঙ্গে থাকা পাসপোর্টের তথ্যমতে, তার গ্রামের বাড়ি ভোলা সদরের দক্ষিণ চরপাতা।পাসপোর্টের সূত্র ধরে জানা যায়, এক বছর আগে ফারিয়াকে রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকার ট্রাভের কেয়ার প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরবে পাঠায়, কিন্তু তারা তাকে সরকারিভাবে না পাঠিয়ে বিমানবন্দরের লোকজন ম্যানেজ করে পাঠায়। আর এখন সেই প্রতিষ্ঠানটি তাকে পাঠানোর বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকারও করছে।

তারা জানান, তারা গত এক বছর থেকে কোনো নারীকর্মী সৌদিতে পাঠায়নি। ট্রাভের কেয়ার প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সুফিয়ান জানান,গত এক বছর থেকে কোনো নারীকর্মী বিদেশে পাঠায়নি। আর যাদের এক বছর আগে যাদের পাঠানো হয়েছে, তারা কোনো ধরনের সমস্যায় পড়েনি।
আর কেউ নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন কি না, বিষয়টি তার নজরে নেই। বিদেশ যাওয়ার পর কেউ আর অভিযোগও করেন নি ।

গত জুন থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার হয়ে সৌদি থেকে ১৩৭ জন নারী দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে ৪ জুন রাতে সৌদি আরবের রিয়াদ সফর জেল থেকে দেশে ফেরেন ৩০ নারী। আবার ১৮ জুন দেশে ফেরেন ১৬ নারী গৃহকর্মী এবং ১৯ জুন রাতে ও সৌদি আরবের রিয়াদ সফর জেলের অভিজ্ঞতা নিয়ে এয়ার এরাবিয়ার বিমানে দেশে ফিরেন ২৭ নারী।২৬ জুন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে দেশে ফেরেন আরও ২২ নারী। সে সময় জানা যায়, দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন আরও ২৩১ নারী গৃহকর্মী।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
%d bloggers like this: